ইবনে সিনা পুরো জীবনি (পার্ট-২)

কে এই ভাবুক কিশাের? কে আবার—ইবনে সিনা!

দুনিয়াজুড়ে সাড়া জাগালেন অতি অলপ বয়েসে দর্শন, বিজ্ঞান আর চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদান রেখে।যেই ছেলেটিকে ছোট বেলায় সবাই হোসাইন বলে ঢাকতও সেই ছেলেটিইতো একদিন দশদিকে জ্ঞানের আলোয় ভাসিয়ে দিলেন।  যুগস্রষ্টা এই মনীষীর পুরাে নাম আবু আলী আল হােসায়েন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। সংক্ষেপে বু আলী সিনা অথবা ইবনে-সিনা। আভি সিনা নামেই পরিচিত ইউরােপীয়দের কাছে যিনি ছিলেন।

নানা রােমাঞ্চে ভরপুর ছিল ইবনে সিনার গােটা জীবনটাই। বিশ্বব্যাপী সত্যমিথ্যা কথা দিয়ে যে কাহিনী রটেছে তার ইয়ত্তা নেই তাঁর অবিশ্ববাস্য ক্ষমতা আর গুণাবলি নিয়ে । কিন্তু সেই গল্প থেকে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা খুঁজে বার করাও অসম্ভব। কেননা তার ঘটনাবহুল জীবন ছিল রূপকথাকেও হার মানানাের মতাে।

মুসলিম স্বর্ণযুগে যে কজন বরেণ্য মানুষ বিশ্বের ভাবজগতে আলােড়ন আনেন, তাদের মধ্যে ইবনে সিনার নাম বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত। এই মনীষীর বিপুল কর্মকৃতির খুব সামান্য ইতিহাসই এ-পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেছে।

কিন্তু সারা পৃথিবী  চমকে উঠেছে তাতেই। অহঙ্কারী ইউরােপও মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়েছে। প্রাচীন কালের গ্রিক মনীষী প্লেটো,  এ্যারিস্টটল ও সক্রেটিস এর মতাে ইবনে সিনা নামটিকেও তারা অতি যত্নে লিপিবদ্ধ করেছে সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবহমান ইতিহাসে। তবে তাঁর আসনটি নির্ধারিত হয়েছে কিছুটা অনুজ্জ্বল অধ্যায়ে কারণ পূর্বোল্লিখিত ইউরােপীয় মনীষীদের মতাে ব্যাপক পরিচিতি না-পাওয়ায় । কিন্তু সবাই স্বীকার করেছেন এ-কথা যে-আল বেরুনী, আল রাজি অথবা ওমর খৈয়ামের মতাে, ইবনে সিনার সুবিচার করে নি প্রতিও ইতিহাস। কিন্তু তাতে কীহয়েছে! ইবনে সিনা উদ্ভাসিত হয়েছেন স্বমহিমায়।

জন্ম মধ্যযুগে ইবনে সিনার, যখন চাপা পড়ে ছিল শাসকের দম্ভ মানুষের মানবিক বৃত্তিগুলাে ,ক্ষমতালিপ্সার অন্ধকার গুহায় আর উচ্ছলতায়।  অর্থাৎ হানাহানি ছিল নিত্যকার ব্যাপার। এরকম একটা অদ্ভুত সময়ে ইবনে সিনার মতাে সর্বতােমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষের আবির্ভাব বিস্ময়কর বৈকি! চারদিকে অশান্তি আর অস্থিতি। শাসকদের ক্ষমতার মােহ ছিল বংশানুক্রমিক।

আবার ধর্মীয় গোঁড়ামি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল । কত রক্ত ঝরানাে হয়েছে তার হিশেবে নেই স্রেফ ধর্মের দোহাই দিয়ে সেকালে। এ অবস্থায় মেধাবী মানুষের চিন্তাভাবনা যে পদে পদে হােচট খাবে তাতে আর কোন সন্দেহ নাই!

একজন বিশিষ্ট গবেষক এই দুঃখজনক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এভাবে: ‘প্রাচ্যের মানসিক আবহাওয়াই ছিল এ অবস্থার জন্যে দায়ী। এ আবহাওয়া বাস্তব চিন্তাচেতনা নিয়ে মানুষকে বেশিদূর এগােতে দেয় না। মানুষকে আঁকড়ে ধরে নানা পারলৌকিক ভাবনা সত্য খুঁজে বের করার বয়েস এলেই । ফলে সত্য উদঘাটনের নিরপেক্ষভাবে বিজ্ঞানজগতের কোনাে উৎসাহেই আর ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে না।

বলা বাহুল্য, ইবনে সিনার জীবনও এই পরিস্থিতির বাইরে আবর্তিত হয় নি। ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল এটাই যে, তিনি নিজের অসামান্য প্রতিভাবলে দর্শন ও বিজ্ঞানের সেকেলে বৃত্তটি ভেঙে বাইরে বেরুতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি যে কতখানি সফল হয়েছে দোনিয়ার মুনুষ সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরিতাপের ব্যাপার এটাই যে, তীর অসমাপ্ত কিন্তু  এটা চিরন্তন সত্যযে উনার এই লক্ষ্যকে আর কেহ এগিয়ে নিয়ে যাইনি।

অগ্রজের ব্যবহৃত পথে অগ্রসর না হয়ে তারা বরং চর্বিত চর্বন করেছেন। এইভাবে স্তুপীকৃত হয়েছে। পুরনাে তত্ত্বেরই নতুন নতুন ব্যাখ্যা। ইবনে সিনা দর্শন ও বিজ্ঞানকে বিবেচনা করেছিলেন নবতর দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি ছিলেন উদার মনের— মানুষ। তিনি কখনোই ধর্মের নামে বাড়াবাড়িটা পছন্দ করতেননা। তার কাছে মানুষ ছিল সবকিছুর ওপর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সংস্কৃতি সবার জন্যে। বাতাস অথবা আলো যেমন মানে না কোনাে সীমারেখা, সংস্কৃতি তেমনি মুক্ত এবং সর্বগামী। কোনাে বিশেষ দেশ অথবা জাতি বা ধর্মের বেড়া দিয়ে তাকে আটকিয়ে রাখা যায়না। তাই, দর্শন, বিজ্ঞান ও কৃষ্টি চর্চায় যাঁরা নিবেদিত, তাদের অবদান কারাে একক সম্পত্তি –নয়—তা সারা পৃথিবীর সব মানুষের জন্যে।

ইবনে সিনা স্পর্শ করেছেন কর্মচঞ্চল জীবনে জ্ঞানবৃক্ষের প্রতিটি শাখাই। আর যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই উঠেছে সুস্বাদু ফল ঝলমল করে। সেখানেই ফলেছে হিরা। অথচ একসময় গুণী চিকিৎসক হিশেবেই কেবল গণ্য করা হত উনাকে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে এই ধারণা বলবৎ ছিল ষােড়শ শতাব্দী পর্যন্ত। পরে ইবনে সিনা স্বীকৃত পেয়েছেন একজন উচুদরের দার্শনিক হিশেবে সব জায়গাতেই ।

ইবনে সিনার মতে, প্রকৃত দর্শন তিনভাগে বিভক্ত। যেমন ন্যায়শাস্ত্র (Logic), পদার্থবিদ্যা (Physics) এবং মনােবিজ্ঞান (Metaphysics)। তিনি বলতেন, একজন প্রকৃত দার্শনিকই হলেন সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। পাশ্চাত্যের বিদ্বজ্জনমণ্ডলে ইবনে সিনার যেসব মতবাদ সম্মানের সঙ্গে গৃহীত হয়েছে, মূলাকাত হচ্ছে সেগুলাের অন্যতম। মূলত এমন এক বিষয় এই মূল্যাকাত বা Intentio , যা অনুভব করা যায় পরােক্ষ ও প্রত্যক্ষ —ধার্মিক মুসলমান সমাজে নিন্দিত হয়েছিল এই দুভাবেই। এই দর্শন অগ্রাহ্য করেছিল কোরআন ও হাদিসে অভ্যন্ত মুসলিম সমাজ। কেবল তাই নয়, তারা ‘গ্রিকের কুকীর্তির কাহিনী ও কিঞ্চিৎ ধর্মীয় উপদেশ’ এবং কোরআনের দর্শনের মতবাদ খণ্ডনের দুটি পুস্তিকাও প্রকাশ করে চাক্ষুষ প্রমাণ নামে । ইবনে সিনাকে ইমাম গাজ্জালি (রাহ) কাফের বলেও অভিযুক্ত করেছিলেন।

মানুষের দেহ বিভক্ত হলেও আত্মা বিভক্ত হয় না সেটা ইবনে সিনা বলতেন। সেই কারণে দেহ বিনষ্ট হবার পরও আত্মা অবিকৃত থাকে। শুদু তাইনয়  তিনি অদৃষ্টবাদেও বিশ্ববাস করতেন। উনার মতে মানুষের কোনাে হাত নেই জন্ম, মৃত্যু ও সুখ-দুঃখের ওপর। সবকিছুই ভাগ্যের অধীন। ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে এমন এক মহাশক্তি—যা অনাদি অবিনশ্বর ও অনন্ত। আত্মা সম্পর্কে ইবনে সিনার মতের অনেক মিল রয়েছে ফরাসি দার্শনিক দেকার্তের মতের সঙ্গে।

যাই হােক, এসব মতামত তখনকার মুসলমান সমাজকে ক্রুদ্ধ করেছিল। শােনা যায়, সে সময়ের এক বিশিষ্ট দার্শনিক মৃত্যুশয্যায় মন্তব্য করেন: ‘খােদা যা বলেছেন, তাই সত্য; ইবনে সিনাই মিথ্যাবাদী।’ কিন্তু এই প্রতিক্রিয়ায় ইবনে সিনা উত্তেজিত হন নি। ধর্মের নানা জটিল মতবাদকেও তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে বিচার করেছেন। তাঁর সঙ্গে অকাট্য যুক্তি দিয়ে গাজ্জালির মত খণ্ডন করেছেন ইবনে রুশদ নামে আরেকজন দার্শনিকও।

পরবর্তীকালে অবশ্য ইসলামি মতবাদের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব মতবাদের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন ইবনে সিনা। ইবনে সিনা আত্মার অমরত্ব ও অবিনশ্ববরতার কথা সহজবােধ্যভাবে তুলে ধরেছেন। সে-সময় প্রাচ্যে এই প্লেটোর মতবাদ বলে পরিচিত ছিল এ্যারিস্টটলের এবং এর বিপরীত মতবাদ। এক সুন্দর সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায় ইবনে সিনার মতবাদ এবং ধর্মমতের মধ্যে। ইবনে সিনাও তাঁর চিন্তাধারাকে তুলে ধরেছেন কবিতার পঙক্তিতে সেকালের অন্যান্য মুসলমান দার্শনিকের মতাে। তিনি পাখির সঙ্গে তুলনা করেছেন একটি কবিতায় আত্মাকে। এই পাখিটি মায়াভরা পৃথিবীর সব বন্ধন ছিন্ন করে উধ্বলােকে উড়ে যেতে চায় পরমাত্মার কাছে। ছটফট করে জীবনভর সে এই আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে। মরণের দূত এসে তার খাচার দুয়ার খুলে দেয় অবশেষে

কেবল কবিতা নয়, ইবনে সিনা গদ্যও লিখতেন। দর্শন ও সাহিত্যের পাশে বিজ্ঞানকে বেমানান মনে হলেও তীর মধ্যে এই দুয়ের বিচিত্র সমন্বয় ঘটেছিল। নিজের জীবনকালে দার্শনিক খ্যাতি তেমন বিস্তৃত না-হলেও চিকিৎসক হিশেবে তাঁর কৃতিত্বের খবর সমগ্র প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘আল মুয়াল্লিম আসসানি’ ইবনে সিনাকে বলা হয়  বা দ্বিতীয় শিক্ষক। প্রথম শিক্ষক হিশেবে গ্যালেনকে বিবেচনা করা হয়েছে।

ইবনে সিনা রােমক, গ্রিক, চৈনিক ও ভারতীয় চিকিৎসা-পদ্ধতির সার সংগ্রহ করে ‘কানুন’ বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সূত্রাবলি রচনা করেন। পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত এই বইয়ের ৭৮৫টি ভেষজ দ্বিতীয় খণ্ডে, খনিজ ও প্রাণিজ্য ওষধির বর্ণনা আছে। এর মধ্যে অনেকগুলােই এখনাে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পামির অঞ্চলের অধিবাসীদের বিশ্ববাস মধ্য এশিয়ার সােনালি ঈগল ও দীর্ঘপুচ্ছ সমুদ্রঈগলের পিত্তে ওষধিগুণ আছে। প্রচণ্ড মাথাধরা বা মানসিক রােগে এ ওষুধ আশ্চর্য ফলদায়ক। ওষধিগুণ রয়েছে আলপাইন-টার্কির মাংসেও। পামির এলাকায় গ্যাস্ট্রিক ও চক্ষুরােগের চিকিৎসায় এই মাংস আজো কাজে লাগে। এসব ওষধি সম্পর্কে ইবনে সিনা হাজার বছর আগেই বিশদভাবে লিখে গেছেন। অলপকাল আগে তার লেখা যে চিকিৎসাগ্রন্থটি পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, তিনিই সাইকোথেরাপি বা মনােচিকিৎসার উদ্ভাবক। আগেই বলা হয়েছে, ইবনে সিনা বিভিন্ন দেশের প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র ঘেঁটে সেগুলাের সার-সংকলন করেন। ফলে প্রশ্ন তােলেন অনেকেই তার গ্রন্থের বা তত্ত্ব মৌলিকতা নিয়ে। কিন্তু কিছুকাল আগে অধ্যাপক সিফাউল মূলক হাকিম আবদুল লতিফ দিল্লির জামিয়া মিলিয়া গ্রন্থাগারে ইবনে সিনার একটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেছেন ।ইবনে সিনা যে ওষুধের বিধান দিয়েছেন এই পাণ্ডুলিপির ওপর গবেষণায় ব্রতী হয়ে অধ্যাপক দেখেছেন, হৃদরােগের চিকিৎসায় তা সম্পূর্ণ মৌলিক।

একটি-দুটি নয়— ইবনে সিনা মােট বই লিখেছিলেন নিরানব্বইটি । এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত ‘আশ শেফা’ ও ‘আল কানুন’ই । বিশ খণ্ডে প্রাণী আশ শেফার, উদ্ভিদতত্ত্ব, রাজনীতি ও অর্থনীতি প্রসঙ্গ আলােচিত হয়েছে। আল কানুন পাঁচ খণ্ডে রচিত। প্রায় দশ কোটি শব্দ এতে রয়েছে। মােট পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ সাধারণ হিশেবে এ বইয়ের। তাঁর লেখা আরযুজাফিল তিব্ব’ একটি চিকিৎসা গ্রন্থ পদ্যাকারে লেখা। এ বইয়ে কবিতা আছে ১৩৩৬টি। রােগের বর্ণনা ও তার ভাল চিকিৎসার  সুবিধার্থে তিনি সহজ পদ্যের আকারে নতুন চিকিৎসকদের জন্যে  এ বইটি লিখেন। বলা বাহুল্য, লুফে নিয়েছিলেন তরুণ চিকিৎসকরা এই ছন্দোবদ্ধ ব্যবস্থাপত্র।

ইবনে সিনার প্রভাব ছিল প্রবল মধ্যযুগে সারা বিশ্বেই। দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাঁর পাঠ্যপুস্তক হিশেবে নির্ধারিত ছিল অসামান্য চিকিৎসাগ্রন্থ আল কানুনের লাতিন অনুবাদ ইউরােপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলােতে। লাতিনে কানুনের তরজমা করেন ক্রিমােনায় জিরার্ড। মাস্টার অফ মেডিসিন বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরু বলে ইউরােপীয়রা ইবনে সিনাকে অভিহিত করেছিল। প্রাচ্যের গ্যালেন বা আরব গ্যালেন হিশেবে  আজো ইউরােপে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ।

স্যার অসলারের মতে, বাইবেল বলে আদৃত হয়ে আসে নি দুনিয়ায় অন্য কোনাে বই-ই কানুনের মতাে এত দীর্ঘকালব্যাপী চিকিৎসাশাস্ত্রের। এখনাে দেখতে পাওয়া যায় এ বইয়ের বহু ভাষায় বহু অনুবাদ । ইউরােপে এর চাহিদা ছিল নানা জায়গায় খুবই বেশি। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ বছরে এর যে-ষােলটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়, তার একটি হিব্রুতে আর পনেরটি ছিল লাতিনয়ে।

অনুবাদের হিড়িক লেগে যায় ইউরােপীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণের যুগে মুসলমান লেখকদের বিজ্ঞান বিষয়ক বই। তবে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আগে পর্যন্ত প্রাচ্যের সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি মুসলিম কৃষ্টির সঙ্গে ইউরােপীয় সংস্কৃতি বা কালচারের । স্পেনের মুসলমানদের সহায়তায় ঘুমন্ত ইউরােপ ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করে। স্পেনীয়দের অনুপ্রেরণাতেই মুসলিম পণ্ডিতদের লেখা বিজ্ঞান-বিষয়ক কিছু কিছু বই লাতিনে অনূদিত হতে থাকে। ইউরােপে প্রকৃত জাগরণ আসে দ্বাদশ শতাব্দীতে। সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা আরম্ভ হয় বলতে গেলে সেই সময়েই।

ত্রয়ােদশ শতাব্দীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিরাট উৎকর্ষ অর্জন করে ইউরােপ। ইউরােপীয় মিশনারি জে. জে. ওয়াশাক এই যুগকে শ্রেষ্ঠ যুগ বলে অভিহিত করেছেন। মূলত এই সময় থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইউরােপীয় আধিপত্যের সূচনা এবং একই সঙ্গে আগেকার মুসলিম গীরব ধীরে ধীরে মান হয়ে আসতে শুরু করে। আর প্রাচ্যের অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে ইউরােপ ক্রমান্বয়ে এগােতে থাকে উন্নতির পথে। বস্তুত মুসলিম সভ্যতার ভিত্তির ওপর ত্রয়াদেশ শতাব্দীতেই গড়ে ওঠে ইউরােপীয় সভ্যতার বিশাল প্রাসাদ। ইউরােপের আদলটাই যায় পাল্টে। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার এটাই যে, দু-তিনশাে বছরের মধ্যেই ইউরােপ তার ত্রিসীমানা থেকে আরব সভ্যতার বহিরাবরণ পুরােপুরি মুছে ফেলে। ইউরােপকে আরব তথা মুসলিম-বিশ্ব কী শেখাল, বাইরের জগৎ থেকে সে-কথা বুঝবার কোনাে উপায়ই আর থাকল না। তবে বাইরের পালিশ বদলে ফেললে হবে কীভেতরে ভেতরে আরব সভ্যতা সমগ্র ইউরােপে তার অপ্রতিহত প্রতিপত্তি চালিয়ে যেতেই থাকে।

ইবনেসিনা জীবনীর তৃতীয় পার্ট পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

আপনার যদি রক্তের প্রয়োজন হয় অথবা কাউকে যদি রক্তে দিয়ে সহযোগীতা করতে চান তাহলে এখনে ক্লিক করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here