ইবনে সিনা জীবনি পুরো জীবনি (আমরা অনেকেই জানিনা)

আসসালামু আলাইকুম। আমরা অনেকেই হয়তো উনার নাম শুনেছি অনেকের মুখে মুখে ইবনে সিনা কিন্তু আমরা প্রাই ৯৫% মানুষই উনার জীবনী সম্পর্কে কিছুই জানিনা। তাই আজ থেকে ধাপে ধাপে উনার জীবনী আপনাদের সামনে তুল ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

(পার্ট নং- ১)

মিহিরাগন উৎসব! সারাদেশ মেতে উঠেছে অফুরান আনন্দে। হাসিখুশি রঙ-তামাশা আর নাচেগানে ঝলমল করছে সমগ্র বােখরা। সেজেগুজে রাস্তায় | বেরিয়েছে শিশু আর কিশাের-কিশােরীরা। বেণিতে গােলাপ লাগিয়ে হাততালি। দিয়ে গান ধরেছে সুন্দরী যুবতীরা। ফলের আরৎগুলি উপচে উঠেছে ক্রেতার ভিড়ে। অনেক বৃদ্বরাও খচ্চরের পিঠে বসে আজ বেড়াতে বেরিয়েছেন নগরীর রাজপথে। এমন আমােদ-আহ্লাদের দিনে বিদেশিরাও ঘরে বসে নেই। তারাও দল বেঁধে এই বিচিত্র উৎসব দেখতে ও তাতে শরিক হবার জন্যে চিত্রিত আলখাল্লা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন বাইরে। বােখারায় আজ ছুটির দিন। আজ কোনাে কাজে নেই। আজ কোন কাজ নেই তাই সকলেই এই আনন্দ উপভুগ করার জন্য মেতে উঠেছে।

কেবল একটি ছেলের মুখে হাসি নেই। কে সে? নাম তার হােসায়েন। বােখারার দেওয়ান আবদুল্লাহর পুত্র। ফুটফুটে চেহারা। বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখে হাজারাে জিজ্ঞাসার অজস্র ঝিকিমিকি। বয়েস মােটে দশ বছর, অথচ এরি মধ্যে মুখস্থ করে বসে আছে পুরাে কোরআন শরিফ। তা, হাসিখুশি হােসায়েন অমন বিমর্ষ কেন আজ? কী হয়েছে তার? না, তার নিজের কিছুই হয় নি। তাদের মহল্লার একটি যুবক আজ মধ্যরাতে মারা গেছে। গােটা তল্লাটের সব বয়েসের মানুষ সেই যুবককে ভালােবাসত। চমৎকার চেহারা ছিল তার। আর ছিল নিটোল স্বাস্থ্য। যত বুদ্ধি ততই সাহস। আর ছিল মায়াভরা মন। আপন-পর যেই কোন মানুষের কারাে কোনাে বিপদ ঘটলে সবার আগে ছুটে যেত এই মারুফ। ওর বাবা ইয়াকুব বােখারি তিনি ৩ রাস্তার মােড়ে একটা ছােট্ট সরাইখানা চালান। বুড়াে বয়েসে মােসাফিরদের দেখাশােনা করতে কতইনা কষ্ট তার! তবু তিনি মারুফকে দোকানে বসান নি। ছেলের যেরকম দয়ার শরীর গরিব লােকদের বিনে পয়সায় খাইয়ে লালবাতি জ্বেলে দেবে ব্যবসায়!

পাড়ার ছেলেদের সর্দার ছিল মারুফ। আর হােসায়েন ছিল তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। মারুফ অমন দুম করে মরে যাবে তা সে স্বপ্নেও ভাবে নি। সকালে সারা শহর যখন আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠতে শুরু করেছে, মারুফের যত্রায় তখন শামিল হলও মন মরা হোসায়েন। বড়রা প্রথমে সঙ্গে নিতে চাননি তাকে। একে তাে দেওয়ানের ছেলে, আবার হচ্ছে বয়স অল্প। বাচ্চাদের গােরস্তানে যেতে দেয়া এমন উৎসবের দিনে কি ঠিক হবে? নামানাে গলায় একজন বলেই ফেললেন, শােনাে হােসায়েন! তুমি বরং নতুন জামাকাপড় পরে বন্ধুদের সঙ্গে বাদশাহি বাগানে বেড়াতে যাও। সেখানে নাকি এক বিদেশি জাদুকর নানারকম হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাবে। কিন্তু শবমিছিল থেকে কিছুতেই সরানাে গেল না হােসায়েনকে। সামনে এক  পাহাড়। সবাই এগিয়ে চলছে সেই দিকেই। সবার পেছনে হোসায়েনকে ছােট ছােট পায়ে হেঁটে যেতে দেখল, ফুলে ফুলে ঢাকা মারুফের কফিনের ওপর ভ্রমর উড়ছে। সে জানে, ওই পাথুরে পাহাড়ের ওপরে আছে চওড়া চাতাল। এ তল্লাটে কোনাে লােক মরে গেলে, ওখানেই তাকে কবর দেয়া হয়।

গােরস্তানে আঁকাবাঁকা রাস্তায় পৌছে শববাহকরা আর কিছুতেই দেরি করল না। দোয়াদরুদ পড়ে, মারুফকে সমাহিত করে তাড়াতাড়ি নিছে নেমে গেল তারা। এত বড় একটা উৎসব চলছে দেশে। তারাও যে তাতে শামিল হবে। বুড়াে ইয়াকুব বােখারি অনেকক্ষণ ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেন। তারপর তিনিও চোখ মুছতে মুছতে পাগড়ির কাপড় দিয়ে চলে গেলেন। স্তব্ধ, জনশূন্য কবরখানায় একপ্রান্তে হােসায়েন তখনাে বসেছিল গালে হাত দিয়ে। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকটা পাথরের চাঁই আছে । তারই একটার ওপর বসেছিল হােসায়েন। ব্যস্ত ছিল বলে, তাকে খেয়ালই করে নি যাবার সময় শবযাত্রীরা। এমনকি ইয়াকুবও টের পান নি।

একটা দীর্ঘনিশ্ববাস ফেলে পাথরটার ওপর থেকে নেমে এল হােসায়েন। ধারে কাছে কেউ আছে কিনা, তা লক্ষ করল। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মারুফের টাটকা কবরটির দিকে। চারদিকে চারখও পাথর। মাঝখানে কাঠের তৈরি একটা কফিন। ছােটবড় আশপাশে আরাে অনেক কবর আছে। তবে সেগুলােকে মনে হয় ক্ষয়ে যাওয়া টিবির মতােই । রােদ-বাদলা আর তুষার-ঝড়ের ধকল বয়ে সেগুলাে কোনােমতে যেন টিকে আছে অতীতের সাক্ষীস্বরূপ। সব থেকে নতুন মারুফের কবরটি । হােসায়েন কবরটার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবল: মানুষ মরে কেন? সে মনে মনে চিন্তা করল, মরার পর মানুষের আত্মা কি শরীরের ভেতরেই থাকে? নাকি তা বাইরে বেরিয়ে ওই শেষনিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গেই হাওয়ায় মিশে যায়? বড়দের মুখে হােসায়েন শুনেছে, মানুষের শরীর মরে; কিন্তু মরে না আত্মা।

এরকম নানা কথা নাড়াচাড়া করতে করতে থাকে তার মনের মধ্যে হঠাৎ তার ইচ্ছে হল, কফিন বক্সের ডালা খুলে সে একটু হলেও মারুফের লাশটাকে দেখবেই। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ। হােসায়েন কফিন বক্সের ঢাকনা তুলে যখন কাফনের কাপড়টা মারুফের মুখের ওপর থেকে সরাতে গেল। কিন্তু সে আর সরাতে পারল না। বরং হাতটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। বুকের ভেতর ধড়ফড় ধড়ফড় শুরু করছে। সে মরিয়ার মতাে হ্যাঁচকা টানে কাপড়টুকু সরাতে যাবে—হঠাৎ অদূরেই  এক মহা সােরগােল জেগে উঠল। হােসায়েন কফিনের ডালাটা দড়াম করে ফেলে দিয়ে চাতালের উত্তর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওয়াতে তার চুল উড়ছিল। এই ছোট্ট বাচ্চার কচি মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আন্তর লােবান আর কপূরের ব্রাণে ম ম করছে সবটা গােরস্তান নিস্তব্দ ।

হােসায়েন অবাক হয়ে দেখল, উত্তরের মস্ত উঁচু খাড়া পাহাড় থেকে এক কাগজের পাখি হাওয়ায় ভেসে ভেসে লাফালাফি করছে কয়েক হাজার লােক। কানে আসছে শিঙার আওয়াজ আর দামামা। সেইসঙ্গে উল্লসিত মানুষের প্রচণ্ড হৈ-হাল্লা। এই এক রীতি মিহিরগন উৎসবের। উৎসবেরই একটা পর্যায়ে এসে নগরবাসী বানানাে রঙিন কাগজে ওই ঢাউস পাখির গায়ে আগুন লাগিয়ে তা পাহাড় থেকে নিচে ছেড়ে দেয়। আর পাখিটা পুড়তে পুড়তে এক বিচিত্র দৃশ্যের ছরতারনা করে হাওয়ায় ভেসে উড়ে যেতে থাকে নিচের গিরিখাত ধরে।

তখন জ্বলন্ত পাখিটা খুবই ধীর গতিতে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিল। একদৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হােসায়েন ভাবল, এমনি করেই বুকের খাঁচা থেকে বাইরে বেরিয়ে উড়ে পালিয়েছে মারুফের প্রাণপাখিতাও। হােসায়েন পাহাড় থেকে নেমে এল ছােট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে । বুকটা যেন তার ফেটে যাচ্ছে মারুফের শােকে। কিন্তু সে তাে কাঁদতেও পারছে না ওর বুড়াে বাপের মতাে।

ঘরে ফিরে হােসায়েন চুপচাপ ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। দূরে ঢেউ খেলানাে পাহাড় সারি সারিতে দারিয়ে রয়েছে। ওখানেই, টকটকে লাল কাপড়ে তৈরি একটা তেকোণা নিশান উড়ছে এক অনুচ্চ পাহাড়ের মাথায় । ওটাই তাে এই এলাকার কবরখানা। ওখানেই যে একলা একা ঘুমিয়ে আছে মারুফ! অনেকক্ষণ ধরে প্রাসাদের জলসাঘর থেকে নাচগানের আওয়াজ আর সমঝদারদের কোলাহল ভেসে আসছিল। সবকিছু হােসায়েনের অসহ্য লাগল। সে কানে আঙুল দিয়ে দুচোখ বুজে অনেক্ষন দাঁড়িয়ে রইল । পরে হৈ-হট্টগােল কমে এলে নিজের ঘরে ঢুকে একটা বই নিয়ে বসল।

ইবনেসিনা জীবনীর দ্বতিয় পার্ট পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন

আপনার যদি রক্তের প্রয়োজন হয় অথবা কাউকে যদি রক্তে দিয়ে সহযোগীতা করতে চান তাহলে এখনে ক্লিক করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here